কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৫০ AM

এক নজরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

কন্টেন্ট: পাতা

পেশাগত নৈপুণ্য আর মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত—কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য আর ইতিহাসের শহর কুমিল্লা কুচাইতলিতে অবস্থিত মানবতার সেবার শপথে হাজারো চিকিৎসক গড়ার আলোকিত ঝর্ণাধারাকুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

১৯৭৯ সালের ২৮ নভেম্বর। দেশে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় রুদ্ধশ্বাস। এমন এক সময় মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, নোয়াখালী সফর শেষে ঢাকা ফেরার পথে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আকবর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লার বর্তমান মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসেযেটি তখন ছিল নিস্তরঙ্গ ধানের মাঠসেখানে মেডিকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এটি ছিল কুমিল্লাবাসীর জন্য এক আশার দীপ্ত সূচনা। শুরুতে অধ্যক্ষের দায়িত্ব তুলে নেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম পাটওয়ারী। ভর্তি হয় ৩০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কেন্দ্রীয় বরাদ্দের অভাবে এই উদ্যোগ স্থায়ী রূপ পায়নি। কলেজের অস্থায়ী কার্যক্রম তখন কুমিল্লা সিভিল সার্জন অফিস থেকে শুরু হলেও, পরবর্তীতে কলেজ বন্ধ করে দিতে হয়। শিক্ষার্থীদেরকে ১৫ জন করে ভাগ করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম ও সিলেট মেডিকেল কলেজে।

এরপর এক দীর্ঘ বিরতির পর আশার নতুন সূর্যোদয় ঘটে ১৯৯১ সালে। এ সময়ে কুমিল্লা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)-এর অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পই পরবর্তীতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মূল কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়। ম্যাটসের হোস্টেল ব্যবহৃত হতে থাকে মেডিকেল কলেজ ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল হিসেবে।

১৯৯১ সালের ভর্তি প্রক্রিয়ায়, মেধাতালিকা থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন নবপ্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে। এরই মধ্যে অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান আনসারী দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে। তিনি প্রথম অফিস আদেশেই ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ-কে হোস্টেল সুপার হিসেবে নিয়োগ দেন। একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আসেম্যাটসের সকল কর্মচারী, সম্পদ ও অবকাঠামো মেডিকেল কলেজের নিমিত্তে ব্যবহৃত হবে।

১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হয় ম্যাটসের গ্যালারিতে। এ সময় পূর্তমন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম, যিনি তখন কুমিল্লা সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন, কর্তৃপক্ষের আহবানে সাড়া দিয়ে বেগম রাবেয়া চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে এই নতুন মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। তিন বছরের মধ্যে, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপ নেয়। সেই ছোট্ট শুরু আজ এক বিশাল পরিধিতে বিস্তৃত— অজুত সহস্র দেশপ্রেমিক যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসক তৈরির পথচলায় কয়েক যুগ ধরে নির্ভরতার নাম কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ।

প্রতিষ্ঠানটির এমবিবিএস কোর্সে বর্তমানে প্রতি বছর ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত মোট ৩৪টি ব্যাচে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ব্যাচকে অভিহিত করা হইয় কুম- উপসর্গ ব্যবহার করে। ইতোমধ্যে কুম-২৮ ব্যাচ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পেশাজীবনে প্রবেশ করে দেশ-বিদেশে মানব সেবার দীপ্ত প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন। ২০০৫-০৬ সাল থেকে এখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা এই কলেজের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটিতে সরকারী ৫০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে ১২০০-১৩০০ জন। বহিবিভাগে প্রতিদিন সেবা নেন ১৫০০ র বেশি সেবা প্রার্থী। জরুরী বিভাগেও শতাধিক রোগীকে সেবা দেয়া হয়। এই বিশাল সংখ্যক অসুস্থ মানুষের কষ্ট লাঘবের কষ্ট সাধ্য কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে এখানকার শিক্ষানবীশ চিকিৎসকেরা একেকজন হয় ওঠেন দরদী, দক্ষ ও চাপ নিতে পারেন এমন কর্মীতে। যেই প্রশিক্ষণ পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে রাখে তাদের।

শুধু পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা সমান উৎসাহে যুক্ত থাকে নানাবিধ সহশিক্ষা কার্যক্রমে, যা তাদের ব্যক্তিত্বকে করে তোলে আরও পরিপূর্ণ ও সমাজোপযোগী। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে—গান, আবৃত্তি, নাটক, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কনসহ নানা শিল্প-সাহিত্যচর্চায়। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল-ব্যাস্কেটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তারা নিজেদের শারীরিক সক্ষমতা ও দলগত নেতৃত্বের পরিচয় দেয়। মানবসেবার ব্রত নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশ নেয় মেডিকেল ক্যাম্প, স্বেচ্ছা রক্তদান, পথশিশুদের সেবা ও দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রমে। এছাড়াও তারা বিজ্ঞানমনস্কতা চর্চার জন্য আয়োজন করে হেলথ অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম, সায়েন্স অলিম্পিয়াড, পাবলিক হেলথ ওয়ার্কশপ ও পোস্টার প্রেজেন্টেশন। এইসব কো-কারিকুলার ও এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা গড়ে তোলে নেতৃত্বগুণ, সামাজিক সচেতনতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ—যা একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব পালনে ভবিষ্যতে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। এই দিক থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

২০২৪ সালের ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় চেতনায় নতুন অধ্যায় রচনা করে। সেই সাহসী অধ্যায়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা ছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন শাসকের রক্তচক্ষু, নিপীড়ন আর ভয়ভীতি গোটা দেশের আকাশ ভারী করে তোলে, তখন এই প্রতিষ্ঠানটির অনেক শিক্ষার্থী-শিক্ষক নির্ভীকভাবে রাজপথে দাঁড়ায় ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার আদায়ের পক্ষে। তারা কেবল শ্লোগানধ্বনিতে নয়, বরং মাঠে-ময়দানে গায়ে গা মিলিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেয়, পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, গ্রেফতার-হয়রানি উপেক্ষা করে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়।

তবে এদের সাহসিকতার আরেকটি অনন্য দিক হলো—মানবসেবায় তাঁদের তাৎক্ষণিক সাড়া। রাজপথে যখন আন্দোলনকারীরা আহত হন, অনেক জায়গায় যখন প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না, তখন কুমেকের ছাত্ররা চিকিৎসা সরঞ্জাম হাতে ছুটে গেছেন রক্তাক্ত ভাই-বোনদের পাশে। নিজেদের তৈরি ফার্স্ট এইড সেল, ব্যান্ডেজ, স্যালাইন, অক্সিজেন, গজ-পট্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন পিলখানার মতো পরিস্থিতিতে। কারও রক্ত বন্ধ করেছেন, কারও চোখ ধুয়ে দিয়েছেন টিয়ার গ্যাসের যন্ত্রণায়, কারও শরীরে ইনজেকশন দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত রক্ত দিয়েও সহযোগিতা করেছেন।

এই দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা কেবল একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসকের পেশাগত প্রস্তুতির অংশ নয়—এটা একট রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানও বটে। এই দ্বিমুখী ভূমিকা—একদিকে প্রতিবাদী কণ্ঠ, অন্যদিকে সেবাপরায়ণ হাত—এই হল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের গৌরবময় উত্তরাধিকার, যা ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শুধু স্নাতক পর্যায়ে থেমে না থেকে, ২০১৪ সালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু হয় ডিপ্লোমা ইন অ্যানেসথেসিয়া (DA), ডিপ্লোমা ইন গাইনী ও অবস (DGO), এবং ডিপ্লোমা ইন ল্যারিংগোলজি ও অটোলজি (DLO)। এরপর ২০১৯ সালে যোগ হয় ডি-অর্থো (D-Ortho), ডিসিএইচ (DCH) ও ডিএমআরডি (DMRD) কোর্সবাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-এর অধীনে এই কোর্সগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসকদের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের দরজা খুলে যায়। এছাড়া এফসিপিএস ডিগ্রির জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেনিং কোর্স তো রয়েছেই। এর পাশাপাশি নার্সিং, ডিপ্লোমা ইন্সটিউট এর মাধ্যমেও দক্ষ নার্স তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ নার্স তৈরীতে ভূমিকা রাখছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ১১ একরের সুবিশাল ক্যাম্পাসে রয়েছে একাডেমিক ভবন, হাসপাতাল ভবন, লাইব্রেরি, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা হোস্টেল, পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন, মসজিদ, শহীদ মিনার, র্গ, নার্সিং কলেজ ও নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউট। প্রায় ১,৮৬,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে রয়েছে কলেজ ভবন এবং ২,৭০,০০০ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে হাসপাতাল ভবন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় এক লক্ষ বই এবং তিন হাজারের বেশি জার্নাল, যেখানে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জ্ঞানচর্চার সুযোগ পান।

চিকিৎসা শিক্ষার এই মন্দিরে রয়েছেন ৪৩টি একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল বিভাগ, যেখানে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ প্রায় ১৩৮ জন শিক্ষক ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে কলেজে ১১০১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যাদের মধ্যে ৬৭৯ জন ছাত্রী এবং ৪২২ জন ছাত্র।

এই চিকিৎসা শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রকে ঘিরেই রয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—এক সময়কার ২৫০ শয্যার প্রতিষ্ঠানটি আজ ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র। ২০০৮ সালে নতুন ৫ তলা হাসপাতাল ভবন এবং ২০২০ সালে ৮ তলা মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড বিল্ডিং এর সংযোজন এই হাসপাতালকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। প্রতিদিন শত শত রোগীর সেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি এখানে ইন্টার্ন ও স্নাতকোত্তর চিকিৎসকদের হাতে-কলমে ক্লিনিকাল প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

২০২৪ সালের পেশাগত পরীক্ষার ফলাফল এ কলেজের শিক্ষা মানের আরেকটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় পাশের হার ৮১.৬৬%, দ্বিতীয়তে ৮৫.৮৮%, তৃতীয়তে ৮২.১৮% এবং চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় ৮৪.১০%—এমন ফলাফল শুধু সংখ্যা নয়, এটি এই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কাঠামো ও শিক্ষকদের নিষ্ঠার প্রতিফলন।

আজ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি প্রেরণার নাম। এখান থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিসরেও চিকিৎসা সেবায় অবদান রেখে চলেছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মেধা, মনন ও মানবিকতা মিলেমিশে তৈরি হয় একজন পরিপূর্ণ চিকিৎসক।

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ

অধ্যাপক ডা। মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন